ফেসবুকে রিলস (Reels) দেখতে দেখতে কখন যে ২-৩ ঘণ্টা পার হয়ে যায়, তা আমরা অনেকেই টের পাই না। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার দেখা ওই ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওটি যে বানিয়েছে, সে হয়তো এই ভিডিও থেকে কয়েক হাজার টাকা আয় করে নিল?
অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন, “আমি তো শুধু টাইমপাস করার জন্য ফেসবুক চালাই, এখান থেকে আবার ইনকাম করা সম্ভব নাকি?”
হ্যাঁ, সম্ভব! এবং সেটা খুব বড় অংকের। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ফেসবুক রিলস (Facebook Reels) হয়ে উঠেছে অনলাইন ইনকামের অন্যতম বড় হাতিয়ার। ইউটিউবের ভিডিও বানাতে অনেক সময় লাগে, এডিট করতে হয়, থাম্বনেইল বানাতে হয়—কিন্তু ফেসবুক রিলস বানাতে লাগে মাত্র হাতে থাকা স্মার্টফোনটি এবং আপনার সামান্য একটু সৃজনশীলতা।
আপনি যদি একজন ছাত্র, গৃহিণী কিংবা চাকরিজীবী হন এবং পড়াশোনা বা চাকরির পাশাপাশি বাড়তি কিছু ইনকাম করতে চান, তবে আজকের এই গাইডলাইনটি আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আজ আমি আপনাদের শেখাব—কীভাবে শূন্য থেকে শুরু করে ফেসবুক রিলস থেকে টাকা আয় করবেন, ভিডিও ভাইরাল করবেন এবং সেই টাকা পকেটে আনবেন।
চলুন, আর দেরি না করে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।
ফেসবুক রিলস আসলে কী? কেন এটি এত জনপ্রিয়?
সহজ কথায়, ফেসবুকে আমরা যে ৬০ সেকেন্ডের কম সময়ের খাড়া (Vertical) ভিডিওগুলো দেখি, সেগুলোকে রিলস বলা হয়। টিকটক আসার পর ছোট ভিডিওর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে যায়। টেক্কা দিতে ফেসবুক নিয়ে আসে ‘Reels’ ফিচার।
কেন আপনি রিলস নিয়ে কাজ করবেন?
১. দ্রুত ভাইরাল হওয়া যায়:
একটি সাধারণ ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হতে সময় লাগে, কিন্তু রিলস ভিডিওর রিচ (Reach) সাধারণ ভিডিওর চেয়ে ১০ গুণ বেশি। নতুন পেজ হলেও ফেসবুক নিজে থেকেই আপনার ভিডিও মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
২. মনিটাইজেশন সহজ:
২০২৬ সালের নতুন আপডেটে ফেসবুক রিলস মনিটাইজ করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে।
৩. অল্প সময়:
একটি রিলস বানাতে ১০-১৫ মিনিটের বেশি সময় লাগে না।
ফেসবুক রিলস থেকে আয়ের ৩টি প্রধান উপায়
অনেকে মনে করেন শুধু ভিউ হলেই টাকা। বিষয়টি তেমন নয়। ফেসবুক রিলস থেকে মূলত ৩টি উপায়ে আয় করা যায়:
১. অ্যাডস অন রিলস (Ads on Reels) – প্রধান আয়
এটিই হলো আয়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আপনার রিলস ভিডিওর নিচে ছোট করে একটি বিজ্ঞাপন (Banner Ad) দেখানো হয়। যত মানুষ ওই ভিডিও দেখবে, তত বেশি আপনার ইনকাম হবে।
- সুবিধা: ভিডিওতে ক্লিক করার প্রয়োজন নেই, শুধু ভিউ হলেই ইনকাম।
- যোগ্যতা: ফেসবুক আপনাকে ইনভাইট করবে অথবা নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া পূরণ করলে এটি চালু হবে।
২. স্টারস (Stars)
ভিডিও দেখার সময় আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন লাইক বাটনের পাশে ‘Give Star’ নামে একটি অপশন থাকে। আপনার ভিডিও যদি কারো ভালো লাগে, তবে দর্শকরা আপনাকে স্টার গিফট করতে পারে। ১০০ স্টার সমান ১ ডলার (প্রায় ১২০ টাকা)।
৩. স্পন্সরশিপ ও ব্র্যান্ড প্রমোশন
আপনার রিলসগুলো যদি নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের ওপর হয় (যেমন: টেক রিভিউ বা বিউটি টিপস) এবং ভালো ভিউ হয়, তবে বিভিন্ন কোম্পানি আপনাকে তাদের পণ্যের প্রচার করার জন্য মোটা অংকের টাকা অফার করবে। বিশ্বাস করুন, অনেক সময় অ্যাডসেন্সের চেয়ে স্পন্সরশিপ থেকে বেশি আয় করা সম্ভব।
শুরু করবেন কীভাবে? (ধাপে ধাপে গাইডলাইন)
হুট করে ভিডিও আপলোড দিলেই হবে না। সফল হওয়ার জন্য আপনাকে একটি প্রফেশনাল প্ল্যান মেনে আগাতে হবে।

ধাপ ১: প্রফেশনাল মোড অন করা বা পেজ খোলা
আপনার যদি একটি সাধারণ ফেসবুক আইডি থাকে, তবে সেটিকে “Professional Mode” এ কনভার্ট করতে হবে।
- কিভাবে করবেন: প্রোফাইলে যান > থ্রি ডট (…) মেনুতে ক্লিক করুন > Turn on Professional Mode এ ক্লিক করুন। অথবা, আপনি চাইলে ভিডিও আপলোড করার জন্য আলাদা একটি Facebook Page খুলতে পারেন। পেজ খোলাটাই দীর্ঘমেয়াদী আয়ের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ।
ধাপ ২: সঠিক নিস (Niche) বা বিষয় নির্বাচন
সবাই যা করছে, আপনাকেও তাই করতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। আপনি যে কাজটি ভালো পারেন, সেটিই বেছে নিন। নিচে কিছু জনপ্রিয় টপিক দেওয়া হলো:
- ফানি ভিডিও বা কমেডি: বিনোদনের চাহিদা সবসময় বেশি।
- এডুকেশনাল বা টিপস: “মোবাইলের গোপন সেটিং”, “রান্নার সহজ রেসিপি”, “ইংরেজি শেখা” ইত্যাদি।
- মিনি ভ্লগ (Mini Vlog): সারাদিন কোথায় গেলেন, কী খেলেন—তা নিয়ে ৬০ সেকেন্ডের ভিডিও।
- টেকনিক্যাল: গ্যাজেট রিভিউ বা অ্যাপ রিভিউ।
ধাপ ৩: ভিডিও তৈরি ও এডিটিং
ভিডিও বানাতে ডিএসএলআর (DSLR) লাগবে না। আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনটিই যথেষ্ট।
- ভিডিও শুট: সবসময় ফোন খাড়া (Vertical) করে ভিডিও করবেন (9:16 ratio)। আলোর জন্য জানলার পাশে দাঁড়াতে পারেন বা কম দামে একটি রিং লাইট কিনে নিতে পারেন।
- এডিটিং: ভিডিও এডিট করার জন্য CapCut বা InShot অ্যাপ ব্যবহার করুন। ভিডিওর অপ্রয়োজনীয় অংশ কেটে ফেলে দিন এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে সুন্দর একটি মিউজিক দিন।
Ads on Reels পাওয়ার যোগ্যতা (Eligibility Criteria 2026)
ফেসবুক থেকে টাকা পেতে হলে আপনাকে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। ২০২৬ সালের আপডেট অনুযায়ী শর্তগুলো হলো:
১. বয়স:
আপনার বয়স অবশ্যই ১৮ বছরের বেশি হতে হবে।
২. পলিসি:
ফেসবুকের Partner Monetization Policy মেনে চলতে হবে। (অর্থাৎ কারো ভিডিও কপি করা যাবে না, ভায়োলেন্স বা অশ্লীল কিছু দেওয়া যাবে না)।
৩. ইনভাইটেশন:
বর্তমানে ফেসবুক অ্যাক্টিভ ক্রিয়েটরদের অটোমেটিক Ads on Reels এর ইনভাইটেশন পাঠায়। তবে সাধারণত গত ৩০ দিনে ১ লক্ষ ভিউ এবং ৫টি অ্যাক্টিভ ভিডিও থাকলে এই অপশন চালু হয়ে যায়।
(নোট: এই শর্তগুলো ফেসবুক সময় সময় পরিবর্তন করে)
রিলস ভাইরাল করার ৫টি গোপন টেকনিক
ভিডিও বানালেই হবে না, সেটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। নিচে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ৫টি টিপস দিলাম:
১. প্রথম ৩ সেকেন্ডের খেলা (Hook):
দর্শকরা স্ক্রল করতে করতে আপনার ভিডিও দেখবে। তাই ভিডিওর প্রথম ৩ সেকেন্ড এমন কিছু বলুন বা দেখান যেন তারা আটকে যায়। যেমন: “এই ভুলটি ভুলেও করবেন না!” বা “শেষ পর্যন্ত দেখুন, চমক আছে!”
২. ট্রেন্ডিং অডিও ব্যবহার:
রিলস আপলোড করার সময় দেখবেন কিছু মিউজিকের পাশে ছোট একটি তীর চিহ্ন (Arrow Sign) থাকে। এর মানে হলো এই মিউজিকটি এখন ট্রেন্ডিংয়ে আছে। এই মিউজিক ব্যবহার করলে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা ৮০% বেড়ে যায়।
৩. সঠিক হ্যাশট্যাগ (#Hashtags):
ক্যাপশনে ভিডিও রিলেটেড ৩-৪টি হ্যাশট্যাগ দিন। যেমন: #FacebookReels #Viral #TechTips #FunnyVideo। অতিরিক্ত হ্যাশট্যাগ দেবেন না।
৪. প্রতিদিন আপলোড (Consistency):
ফেসবুকের অ্যালগরিদম তাদেরই পছন্দ করে যারা নিয়মিত। প্রতিদিন অন্তত ১টি করে রিলস আপলোড করুন। সেরা সময় হলো সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা।
৫. হাই কোয়ালিটি আপলোড:
ভিডিও ঘোলা হলে কেউ দেখবে না। সেটিং থেকে “Upload at highest quality” অপশনটি অন করে দিন।

কপিরাইট থেকে সাবধান! (সতর্কতা) ⚠️
অ্যাডসেন্স বা মনিটাইজেশন পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো কপিরাইট (Copyright)।
- অন্যের ভিডিও: ভুলেও অন্যের ভিডিও ডাউনলোড করে নিজের পেজে দেবেন না। এতে আপনার পেজ Red বা Restricted হয়ে যাবে।
- মিউজিক: বলিউড বা জনপ্রিয় গান সরাসরি ব্যবহার করবেন না। ফেসবুকের নিজস্ব Sound Collection থেকে মিউজিক ব্যবহার করুন। অথবা ভিডিও এডিট করার সময় ভয়েস ওভার (Voice over) দিন। নিজস্ব ভয়েস দিলে মনিটাইজেশন পাওয়া পানির মতো সহজ হয়ে যায়।
“আপনি যদি ভিডিও বানানো ছাড়াও অন্য উপায়ে আয় করতে চান, তবে আমাদের [মোবাইল দিয়ে টাকা ইনকাম করার ১৭টি উপায়] আর্টিকেলটি পড়ে দেখতে পারেন।”
টাকা হাতে পাবেন কীভাবে? (Payment Setup)
যখন আপনার পেজে ১০০ ডলার (প্রায় ১২,০০০ টাকা) জমা হবে, তখন ফেসবুক আপনাকে টাকা পাঠাবে। টাকা তোলার জন্য আপনাকে একটি Bank Account (ডাচ বাংলা, ইসলামী ব্যাংক বা যেকোনো বাংলাদেশি ব্যাংক) যুক্ত করতে হবে। এছাড়া টিন সার্টিফিকেট (TIN Certificate) সাবমিট করতে হবে, যা এখন অনলাইনে ফ্রিতেই বানানো যায়।
প্রতি মাসের ২১ তারিখে ফেসবুক পেমেন্ট রিলিজ করে এবং ২৬-৩০ তারিখের মধ্যে টাকা সরাসরি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে আসে।
আজই শুরু করুন
প্রিয় পাঠক, “শুরু করব করব” করে সময় নষ্ট করবেন না। ২০২৬ সাল হলো কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের যুগ। আপনার হয়তো মনে হচ্ছে, “আমি কি পারব?”
বিশ্বাস করুন, আজ যারা ফেসবুকে মাসে লক্ষ টাকা আয় করছে, তারাও একদিন আপনার মতোই শূন্য থেকে শুরু করেছিল। আপনার হাতে থাকা মোবাইলটি শুধু বিনোদনের জন্য ব্যবহার না করে, সেটিকে আয়ের উৎসে পরিণত করুন।
শুরুতে ভিউ কম হবে, কেউ দেখবে না—এতে হতাশ হবেন না। টানা ৩ মাস কাজ করুন, সফলতা আসবেই।
ফেসবুক রিলস বা অনলাইন ইনকাম নিয়ে আপনার যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে নিচে কমেন্ট বক্সে জানান। আমি (সাইফুল ইসলাম) আপনাদের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
শুভকামনা আপনার জন্য!
