বর্তমান সময়ে আপনি যদি ইন্টারনেটে আয়ের কথা ভাবেন, আর ‘অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং’-এর নাম শোনেননি, এমনটা হতে পারে না।
আচ্ছা, একবার ভাবুন তো—আপনার কোনো দোকান নেই, কোনো পণ্য নেই, এমনকি পণ্যটি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার টেনশনও নেই; অথচ মাস শেষে আপনার পকেটে হাজার হাজার টাকা ঢুকছে! শুনতে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে, তাই না?
কিন্তু এটি স্বপ্ন নয়, এটিই হলো অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং (Affiliate Marketing)। বর্তমান বিশ্বের হাজার হাজার তরুণ-তরুণী শুধুমাত্র অন্যের পণ্য বিক্রি করে দিয়ে মাসে লাখ টাকা আয় করছে।
আপনি যদি ছাত্র, চাকরিজীবী বা গৃহিণী হন এবং বাড়তি আয়ের একটি বিশ্বস্ত মাধ্যম খুঁজছেন, তবে এই গাইডলাইনটি আপনার জন্যই লেখা। আজ আমরা জানব—অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং কি? কীভাবে শুরু করবেন? এবং বাংলাদেশ থেকে কীভাবে এই টাকা আপনার হাতে পাবেন?
চলুন, শুরু করা যাক।
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং কি? (What is Affiliate Marketing)
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং হলো একটি কমিশন-ভিত্তিক মার্কেটিং ব্যবস্থা।
ধরুন, ‘দারাজ’ বা ‘অ্যামাজন’-এর মতো বড় একটি কোম্পানির হাজার হাজার পণ্য আছে। কিন্তু তাদের পক্ষে একা সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তখন তারা অফার দেয়—”তুমি যদি আমার এই মোবাইলটি বিক্রি করে দিতে পারো, তবে তোমাকে আমি বিক্রির ওপর ৫% কমিশন দেব।”
এখন আপনি যদি সেই মোবাইলটির লিংক আপনার বন্ধু বা পরিচিতদের সাথে শেয়ার করেন এবং কেউ সেই লিংকে ক্লিক করে মোবাইলটি কেনে, তাহলে আপনি সাথে সাথে আপনার কমিশন পেয়ে যাবেন।
অর্থাৎ, এখানে আপনি একজন “ভার্চুয়াল সেলসম্যান” বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছেন।
এটি কীভাবে কাজ করে? (The Process)
পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত ৩টি সহজ ধাপে সম্পন্ন হয়:
ধাপ ১: অ্যাফিলিয়েট প্রোগ্রামে জয়েন করা
প্রথমে আপনাকে এমন একটি কোম্পানি খুঁজে বের করতে হবে যারা অ্যাফিলিয়েট করার সুযোগ দেয় (যেমন: Amazon, Daraz, BDShop)। সেখানে ফ্রিতে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
ধাপ ২: লিংক তৈরি ও শেয়ার
রেজিস্ট্রেশন করার পর আপনি তাদের যেকোনো পণ্যের জন্য একটি ‘ইউনিক লিংক’ (Unique Link) তৈরি করতে পারবেন। এই লিংকটিই হলো আপনার আয়ের চাবিকাঠি।
ধাপ ৩: বিক্রয় ও কমিশন আয়
এখন আপনি এই লিংকটি আপনার ওয়েবসাইট, ইউটিউব ভিডিও বা ফেসবুক পেজে শেয়ার করবেন। যখনই কেউ ওই লিংকে ক্লিক করে পণ্যটি কিনবে, কোম্পানি বুঝবে যে কাস্টমারটি আপনার মাধ্যমে এসেছে। তখন তারা আপনাকে কমিশন দেবে।
কেন অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং শিখবেন? (সুবিধাসমূহ)
অন্যান্য ফ্রিল্যান্সিং কাজের তুলনায় অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং কেন সেরা, তার ৫টি কারণ নিচে দেওয়া হলো:
১. নিজের কোনো পণ্য লাগে না
ব্যবসা করতে গেলে পণ্য কিনতে হয়, স্টক করতে হয়। কিন্তু এখানে পণ্যের মালিক অন্য কেউ। আপনার কাজ শুধু বিক্রি করা।
২. প্যাসিভ ইনকাম (Passive Income)
এটি হলো এই কাজের সবচেয়ে বড় মজা। আপনি একটি ব্লগে রিভিউ লিখে রাখলেন বা ইউটিউবে ভিডিও দিলেন। সেই ভিডিও বা ব্লগ থেকে আগামী ১-২ বছর ধরে সেল আসতে থাকবে, আর আপনি ঘুমানোর সময়ও ইনকাম করতে থাকবেন।
৩. কোনো বস্ নেই
এখানে কেউ আপনাকে অর্ডার দেওয়ার নেই। আপনি যখন খুশি, যেখানে খুশি কাজ করতে পারেন।
৪. কম বিনিয়োগে শুরু
শুরুতে আপনার কোনো টাকা বিনিয়োগ করার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র একটি ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই কাজ শুরু করা যায়।
৫. আনলিমিটেড আয়ের সুযোগ
এখানে আয়ের কোনো সীমা নেই। আপনি যত বেশি সেল করতে পারবেন, তত বেশি আয় করবেন। অনেক মার্কেটার মাসে ৫-১০ হাজার ডলার পর্যন্ত আয় করেন।

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং শুরু করার রোডম্যাপ (Step by Step Guide)
হুট করে লিংক শেয়ার করলেই ইনকাম হবে না। সফল হতে হলে আপনাকে একটি সঠিক পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ মেনে এগোতে হবে।
ধাপ ১: সঠিক নিস (Niche) নির্বাচন
সবকিছু নিয়ে কাজ করতে যাবেন না। যেকোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় বেছে নিন। একে ‘নিস’ বলে। যেমন:
- টেকনোলজি: স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ইয়ারফোন।
- ফ্যাশন: শাড়ি, পাঞ্জাবি, ঘড়ি।
- হেলথ: জিম ইকুইপমেন্ট, প্রোটিন পাউডার।
- ডিজিটাল প্রোডাক্ট: সফটওয়্যার, ই-বুক, অনলাইন কোর্স।
ধাপ ২: প্ল্যাটফর্ম তৈরি
আপনার পণ্যটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য একটি মাধ্যম লাগবে। এটি হতে পারে:
- ব্লগ ওয়েবসাইট: পণ্যের বিস্তারিত রিভিউ লেখার জন্য। (এটি সবচেয়ে কার্যকরী)।
- ইউটিউব চ্যানেল: ভিডিও রিভিউ বা টিউটোরিয়াল তৈরির জন্য।
- সোশ্যাল মিডিয়া: ফেসবুক পেজ বা ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল।
ধাপ ৩: কন্টেন্ট তৈরি (Content is King)
মানুষ তখনই আপনার লিংকে ক্লিক করবে, যখন তারা আপনাকে বিশ্বাস করবে। তাই শুধু “কিনুন কিনুন” না করে, পণ্যটির ভালো-মন্দ দিক নিয়ে সৎ রিভিউ দিন।
- উদাহরণ: “২০২৬ সালের সেরা ৫টি বাজেট স্মার্টফোন” নিয়ে একটি ভিডিও বা আর্টিকেল লিখুন। সেখানে ফোনগুলোর অ্যাফিলিয়েট লিংক দিয়ে দিন।
ধাপ ৪: ট্রাফিক জেনারেশন
আপনার কন্টেন্ট তৈরি শেষ। এখন সেটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এর জন্য এসইও (SEO) শিখতে পারেন যাতে গুগলে সার্চ করলে আপনার আর্টিকেল সবার আগে আসে। অথবা ফেসবুকে বুস্টিং বা গ্রুপ মার্কেটিং করতে পারেন।
জনপ্রিয় কিছু অ্যাফিলিয়েট নেটওয়ার্ক
বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক মিলিয়ে সেরা কিছু প্ল্যাটফর্ম:
১. Amazon Associates:
বিশ্বের ১ নম্বর অ্যাফিলিয়েট সাইট। এখানে সুই থেকে শুরু করে রকেট—সব পাওয়া যায়। কমিশন রেট ১% থেকে ১০%।
২. Daraz Affiliate (বাংলাদেশ):
আমাদের দেশের জন্য সেরা। পেমেন্ট বিকাশে বা ব্যাংকে নেওয়া যায়।
৩. BDShop:
গ্যাজেট এবং ইলেকট্রনিক্স আইটেমের জন্য বাংলাদেশের জনপ্রিয় সাইট।
৪. ClickBank:
ডিজিটাল প্রোডাক্ট বিক্রির জন্য বিখ্যাত। এখানে কমিশন অনেক বেশি (৫০% থেকে ৭৫% পর্যন্ত)।
সফল হওয়ার কিছু গোপন টিপস
১. সততা বজায় রাখুন:
টাকার লোভে কখনো খারাপ পণ্যের রিভিউ করবেন না। একবার যদি অডিয়েন্স আপনার ওপর বিশ্বাস হারায়, তবে আপনি আর সেল পাবেন না।
২. ধৈর্য ধরুন:
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং কোনো “Get Rich Quick” স্কিম নয়। প্রথম ৩-৪ মাস আপনাকে ধৈর্য ধরে কাজ করতে হবে। রেজাল্ট আসতে একটু সময় লাগতে পারে।
৩. ভিডিও কন্টেন্টে জোর দিন:
মানুষ এখন পড়ার চেয়ে দেখতে বেশি পছন্দ করে। তাই রিলস বা শর্টস ভিডিও বানাতে পারেন।
৪. ইমেইল মার্কেটিং:
আপনার ভিজিটরদের ইমেইল লিস্ট সংগ্রহ করুন। পরবর্তীতে নতুন কোনো অফার এলে তাদের মেইল করে জানাতে পারবেন।

টাকা হাতে পাবেন কীভাবে? (Payment Method)
আপনার আয় করা ডলার বা টাকা তোলার নিয়ম একেক সাইটে একেক রকম:
- অ্যামাজন বা ক্লিকব্যাংক: টাকা আনতে পেওনিয়ার (Payoneer) বা সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফার ব্যবহার করতে হয়।
- দারাজ বা বিডিশপ: টাকা সরাসরি আপনার বিকাশ, রকেট বা যেকোনো দেশীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে আসবে। সাধারণত ১০ ডলার (দারাজ) বা ১০০ ডলার (অ্যামাজন) জমা হলেই আপনি টাকা তুলতে পারবেন।
প্রিয় পাঠক, চাকরির বাজারের যে অবস্থা, তাতে শুধুমাত্র একটি আয়ের ওপর নির্ভর করে চলা বোকামি। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং হতে পারে আপনার দ্বিতীয় আয়ের উৎস।
“আমি কি পারব?”—এই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলুন। আজ যারা সফল, তারাও একদিন শূন্য থেকে শুরু করেছিল। আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনটি কাজে লাগান। দারাজ বা অ্যামাজনে একটি ফ্রি অ্যাকাউন্ট খুলুন এবং কাজ শুরু করুন।
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং নিয়ে আপনার যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, বা অ্যাকাউন্ট খুলতে কোনো সমস্যা হয়, তবে নিচে কমেন্ট বক্সে জানান। আমি আপনাদের সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত।
শুভকামনা আপনার সফল ক্যারিয়ারের জন্য!
