“অভিনন্দন! আপনি লটারিতে ১০ লক্ষ টাকা জিতেছেন! টাকাটি পেতে এখনই এই লিংকে ক্লিক করুন…”
আপনার মোবাইলে বা ইমেইলে কি কখনো এমন মেসেজ এসেছে? আমি নিশ্চিত, এসেছে। আর যদি না এসে থাকে, তবে খুব শীঘ্রই আসবে। কারণ ২০২৬ সালে এসে অনলাইনের দুনিয়া যেমন আমাদের জীবন সহজ করেছে, তেমনি একদল প্রতারক বা স্ক্যামার (Scammer) ওত পেতে বসে আছে আমাদের সর্বস্ব লুটে নেওয়ার জন্য।
একজন নতুন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আপনি হয়তো ভাবছেন—”আরে, আমি তো চালাক, আমাকে কেউ বোকা বানাতে পারবে না।”
বিশ্বাস করুন, যারা প্রতারিত হয়েছে, তারাও ঠিক এই কথাটাই ভাবত। স্ক্যামাররা এখন এতটাই স্মার্ট হয়েছে যে, একজন শিক্ষিত মানুষও তাদের ফাঁদে পা দিয়ে লাখ লাখ টাকা খোয়াচ্ছেন। বিকাশ একাউন্ট হ্যাক, ভুয়া চাকরির অফার, কিংবা ই-কমার্সে পণ্যের নামে ইট-পাথর পাঠানো—এগুলো এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেলে আমি আপনাদের শেখাব—অনলাইনে প্রতারণা আসলে কত ধরণের হয়? স্ক্যামার চেনার গোপন ৫টি লক্ষণ কী কী? এবং কীভাবে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে এই ডিজিটাল চোরদের হাত থেকে রক্ষা করবেন?
চলুন, সচেতনতার এই যাত্রায় প্রবেশ করা যাক।
অনলাইন স্ক্যাম বা প্রতারণা আসলে কী?
খুব সহজ ভাষায়— “ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে কারো কাছ থেকে টাকা বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়াকেই অনলাইন স্ক্যাম বা ফিশিং (Phishing) বলা হয়।”
স্ক্যামাররা মূলত মানুষের দুটি দুর্বলতাকে কাজে লাগায়:
১. লোভ (Greed): “টাকা ডবল করে দেব” বা “লটারি জিতেছেন”।
২. ভয় (Fear): “আপনার একাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে” বা “পুলিশ কেস হবে”।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রচলিত ৫টি বড় প্রতারণা
প্রতারক চক্র প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে এই ৫টি স্ক্যাম সবচেয়ে বেশি হচ্ছে:
১. ভুয়া চাকরির অফার (Job Scams)
এটি মূলত ছাত্র এবং নতুন ফ্রিল্যান্সারদের টার্গেট করে করা হয়।
- কৌশল: তারা বলবে—”ঘরে বসে ডাটা এন্ট্রির কাজ করে মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করুন। কিন্তু রেজিস্ট্রেশনের জন্য আগে ৫০০ টাকা বিকাশ করতে হবে।”
- সতর্কতা: মনে রাখবেন, কোনো আসল চাকরি পেতে টাকা লাগে না। যে কোম্পানি আপনার কাছে চাকরির জন্য টাকা চাইবে, বুঝবেন সেটি ১০০% ভুয়া।
২. বিকাশ বা নগদ প্রতারণা (MFS Fraud)
এটি আমরা সবাই জানি, কিন্তু তবুও মানুষ ধোঁকা খায়।
- কৌশল: অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে বলবে—”আমি বিকাশ হেড অফিস থেকে বলছি, আপনার একাউন্ট লক হয়ে গেছে। এখনই কোডটি না দিলে একাউন্ট চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।” অথবা “ভুলে আপনার নম্বরে টাকা চলে গেছে, ফেরত দিন।”
- সতর্কতা: বিকাশ বা নগদ অফিস থেকে কখনোই ফোন করে পিন (PIN) বা ওটিপি (OTP) চায় না।
৩. ই-কমার্স বা অনলাইন শপিং স্ক্যাম
ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখবেন—”৩০ হাজার টাকার ল্যাপটপ মাত্র ১০ হাজার টাকায়!”
- কৌশল: তারা আপনাকে অফারের লোভে ফেলে অগ্রিম টাকা (Advance Payment) চাইবে। টাকা পাঠানোর পর তারা আপনাকে ব্লক করে দেবে অথবা পণ্যের বদলে ছেঁড়া কাপড় বা পাথর পাঠাবে।
- সতর্কতা: অচেনা পেজ থেকে কেনার সময় সবসময় “Cash on Delivery” (পণ্য হাতে পেয়ে টাকা) অপশন ব্যবহার করবেন।
৪. ইনভেস্টমেন্ট বা বিনিয়োগ স্ক্যাম
“১ লাখ টাকা ইনভেস্ট করলে ৭ দিনে ২ লাখ টাকা পাবেন!”—এমন অফার দেখলে দৌড়ে পালাবেন।
- কৌশল: এরা এমএলএম (MLM) বা পিরামিড স্কিম চালায়। শুরুতে আপনাকে কিছু টাকা লাভ দেবে বিশ্বাস অর্জনের জন্য। যখন আপনি লোভে পড়ে বড় অংকের টাকা দেবেন, তখন তারা উধাও হয়ে যাবে।
৫. ফিশিং লিংক (Phishing Links)
মেসেঞ্জারে বা হোয়াটসঅ্যাপে লিংক আসবে—”দেখুন আপনার নামে কী ভিডিও ভাইরাল হয়েছে!” বা “৩০ বছর পূর্তিতে ফ্রি গিফট দিচ্ছে টয়োট!”
- কৌশল: লিংকে ক্লিক করলেই আপনার ফেসবুক আইডি বা ইমেইলের পাসওয়ার্ড হ্যাক হয়ে যাবে।
স্ক্যামার চেনার ৫টি গোপন লক্ষণ (কিভাবে বুঝবেন?)
স্ক্যামাররা যতই স্মার্ট হোক, তাদের কথায় বা কাজে কিছু ভুল থাকবেই। এই ৫টি লক্ষণ দেখলেই বুঝবেন ডাল মে কুচ কালা হ্যায়!
১. তাড়াহুড়ো সৃষ্টি করা (Urgency)
স্ক্যামাররা আপনাকে চিন্তা করার সময় দেবে না। তারা বলবে—
- “অফারটি মাত্র ১০ মিনিটের জন্য!”
- “এখনই টাকা না দিলে পুলিশ আসবে!”
- “এখনই ক্লিক করুন!” টিপস: কেউ যখনই আপনাকে তাড়াহুড়ো করাবে, তখনই থামুন। লম্বা শ্বাস নিন এবং ভাবুন। আসল কোনো কোম্পানি কখনো আপনাকে এভাবে প্রেশার দেবে না।
২. বানান বা ব্যাকরণ ভুল (Poor Grammar)
অধিকাংশ স্ক্যামার খুব বেশি শিক্ষিত হয় না অথবা তারা বিদেশি হ্যাকার হয়ে ট্রান্সলেটর ব্যবহার করে। তাদের মেসেজে খেয়াল করবেন—
- বানান ভুল থাকে।
- বাক্যের গঠন অদ্ভুত হয়।
- লোগো বা ছবি ঘোলাটে হয়।
৩. অবিশ্বাস্য অফার (Too Good to Be True)
যদি কোনো অফার দেখে মনে হয়—”এটা কীভাবে সম্ভব?” তবে ধরে নেবেন সেটা সম্ভব না।
- কেউ আপনাকে বিনা কারণে আইফোন গিফট করবে না।
- কেউ ১ দিনে টাকা ডবল করে দেবে না। লোভ সংবরণ করাই বাঁচার উপায়।
৪. ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া
ব্যাংক, পুলিশ বা কোনো সরকারি অফিস কখনোই আপনার পাসওয়ার্ড, পিন বা ওটিপি চাইবে না। কেউ যদি বলে—”আমি ম্যানেজার বলছি, আপনার পিনটা দিন”—বুঝবেন সে নির্ঘাত চোর।
৫. অদ্ভুত পেমেন্ট মেথড
প্রতারকরা সাধারণত এমন মাধ্যমে টাকা চায় যা ট্রেস করা কঠিন। তারা সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফার না চেয়ে গিফট কার্ড, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা পার্সোনাল নাম্বারে বিকাশ করতে বলবে।

নিজেকে রক্ষা করার ৭টি শক্তিশালী কৌশল
এখন প্রশ্ন হলো, বাঁচার উপায় কী? নিজের ডিজিটাল জীবনকে সুরক্ষিত রাখতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলুন:
১. টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) চালু করুন:
আপনার ফেসবুক, জিমেইল বা যেকোনো একাউন্টে ২-স্টেপ ভেরিফিকেশন চালু রাখুন। এতে কেউ পাসওয়ার্ড জানলেও আপনার মোবাইলে আসা কোড ছাড়া লগইন করতে পারবে না। এটি আপনার একাউন্টের তালা।
২. পাসওয়ার্ড হোক শক্তিশালী:
“123456” বা নিজের নাম পাসওয়ার্ড হিসেবে দেবেন না। পাসওয়ার্ডে বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং চিহ্ন (যেমন: @#$) ব্যবহার করুন। এবং সব জায়গায় একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন না।
৩. লিংকে ক্লিক করার আগে চেক করুন:
কোনো লিংকে ক্লিক করার আগে সেটির URL চেক করুন।
যেমন:
- আসল সাইট:
facebook.com - ভুয়া সাইট:
faceb00k.comবাfacebook-login.xyzখেয়াল রাখবেন ওয়েবসাইটের শুরুতে তালা চিহ্ন (Lock Icon) বাhttps://আছে কি না।
৪. অজানা ফাইল ডাউনলোড করবেন না:
অচেনা ইমেইল থেকে আসা কোনো PDF বা ZIP ফাইল ডাউনলোড করবেন না। এতে ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার থাকতে পারে যা আপনার পিসির সব তথ্য চুরি করবে।
৫. পাবলিক ওয়াইফাই (Public Wi-Fi) ব্যবহারে সতর্কতা:
রাস্তাঘাট বা রেস্টুরেন্টের ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার করে কখনো ব্যাংকিং লেনদেন বা পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করবেন না। হ্যাকাররা পাবলিক ওয়াইফাইতে ওত পেতে থাকে।
৬. কম্পিউটার আপডেট রাখুন:
আপনার ল্যাপটপ বা মোবাইলের অপারেটিং সিস্টেম এবং ব্রাউজার সবসময় আপডেট রাখবেন। আপডেটের মাধ্যমে সিকিউরিটি প্যাচ ঠিক করা হয়।
৭. কমন সেন্স ব্যবহার করুন:
সবচেয়ে বড় অ্যান্টিভাইরাস হলো আপনার মস্তিষ্ক। কিছু করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন—”কেন এই লোকটি আমাকে টাকা দিতে চাইছে?” উত্তর না পেলে এড়িয়ে যান।
প্রতারণার শিকার হলে কী করবেন? (Action Plan)
দুর্ভাগ্যবশত আপনি যদি প্রতারণার শিকার হয়েই যান, তবে প্যানিক না করে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:
১. পাসওয়ার্ড পরিবর্তন:
সবার আগে আপনার সব একাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।
২. ব্যাংককে জানান:
আর্থিক প্রতারণা হলে দ্রুত আপনার ব্যাংক বা বিকাশ হেল্পলাইনে ফোন করে একাউন্ট ফ্রিজ (Freeze) করতে বলুন।
৩. আইনি সহায়তা:
বাংলাদেশে সাইবার ক্রাইম দমনের জন্য পুলিশের বিশেষ ইউনিট আছে।
যেমন:
- হটলাইন: ৯৯৯ (জরুরি সেবা)
- সাইবার হেল্পলাইন: ০১৭৬৬৬৭৮৮৮৮
- ফেইসবুক পেজ: Cyber Police Centre, Bangladesh ৪. ** জিডি (GD) করা:** নিকটস্থ থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করুন। এটি ভবিষ্যতে আপনার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
সচেতনতাই একমাত্র হাতিয়ার
প্রিয় পাঠক, প্রযুক্তি আমাদের বন্ধু, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস কারো জন্যই ভালো নয়। আপনার একটু অসতর্কতা আপনার সারাজীবনের সঞ্চয় নিমিষেই শেষ করে দিতে পারে।
আজকের এই আর্টিকেলটি শুধু পড়ার জন্য নয়, মানার জন্য। এবং এটি আপনার পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য এবং ছোটদের সাথে শেয়ার করুন। কারণ তারাই স্ক্যামারদের সহজ টার্গেট।
মনে রাখবেন, “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু”—অনলাইনের ক্ষেত্রে এই কথাটি ১০০% সত্য।
অনলাইন সেফটি বা টেকনোলজি নিয়ে আপনার যদি কোনো প্রশ্ন থাকে বা আপনি যদি কখনো কোনো সন্দেহজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তবে নিচে কমেন্ট করে জানান। আমি (সাইফুল ইসলাম) চেষ্টা করব আপনাদের সঠিক পরামর্শ দেওয়ার।
সবাই নিরাপদ থাকুন, সুস্থ থাকুন!
