আপনি কি সদ্য ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছেন? ল্যাপটপ কিনেছেন, কাজও শিখছেন, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে এসে আটকে গেছেন? হ্যাঁ, আমি ইন্টারনেট কানেকশন এর কথা বলছি।
একজন ফ্রিল্যান্সারের জন্য ইন্টারনেট হলো পানির মতো। পানি ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচতে পারে না, তেমনি ভালো ইন্টারনেট ছাড়া ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, নতুন অবস্থায় সবার বাজেট থাকে কম। তখন মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—
“আমি কি ব্রডব্যান্ড (WiFi) লাইন নেব নাকি মোবাইল ডাটা দিয়েই কাজ চালাব?” “৫ এমবিপিএস স্পিড কি ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য যথেষ্ট?” “মোবাইল হটস্পট দিয়ে কি পিসিতে কাজ করা ঠিক হবে?”
আজকের এই আর্টিকেলে আমি এই কনফিউশনগুলো একদম দূর করে দেব। আমি আপনাকে কোনো টেকনিক্যাল জগাখিচুড়ি বোঝাব না। একদম সহজ বাংলায় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে জানাব—আপনার কাজের ধরণ অনুযায়ী কোন ইন্টারনেটটি সেরা এবং কেন?
চলুন, ইন্টারনেটের স্পিড মেপে দেখা যাক।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে ইন্টারনেটের গুরুত্ব আসলে কতটুকু?
মনে করুন, আপনি ফাইবার (Fiverr) এ একটি কাজ পেলেন। বায়ার আপনাকে মেসেজ দিল, কিন্তু আপনার নেট স্লো হওয়ায় মেসেজটি পেলেন ১০ মিনিট পর। ততক্ষণে বায়ার অন্য কাউকে কাজ দিয়ে চলে গেছে। অথবা, আপনি গ্রাফিক্স ডিজাইনের একটি বড় ফাইল (২০০ এমবি) ক্লায়েন্টকে পাঠাচ্ছেন, কিন্তু মাঝপথে নেট ডিসকানেক্ট হয়ে গেল। কেমন লাগবে তখন?
ফ্রিল্যান্সিংয়ে স্পিড (Speed) এবং স্ট্যাবিলিটি (Stability)—এই দুটি জিনিস আপনার রেপুটেশন বাঁচাতে পারে আবার ধ্বংসও করতে পারে। তাই ইন্টারনেট কানেকশন নিয়ে কোনো হেলাফেলা করা উচিত নয়।
মোবাইল ডাটা (Mobile Data): সুবিধা ও অসুবিধা
শুরুতে প্রায় সব ফ্রিল্যান্সারই মোবাইল ডাটা দিয়ে কাজ শুরু করেন। কারণ এটি সহজলভ্য। গ্রামীণফোন, রবি বা বাংলালিংক—সিম কিনলেই নেট চালু।
সুবিধা (Pros):
১. সহজলভ্য: লাইন নেওয়ার বা তার টানার কোনো ঝামেলা নেই। যেখানে খুশি সেখানে বসে কাজ করা যায়।
২. লো-শেডিং সমস্যা নেই: কারেন্ট চলে গেলেও ফোনের নেট চলে। তাই কাজ আটকায় না।
৩. ব্যাকআপ: ব্রডব্যান্ড লাইন কাটা পড়লে এটিই একমাত্র ভরসা।
অসুবিধা (Cons):
১. অস্থির স্পিড (Unstable): এই ফোর-জি (4G) ফুল স্পিড, আবার একটু পরেই টু-জি (2G)। বিশেষ করে রুমের ভেতরে বা বৃষ্টির দিনে নেট খুব ডিস্টার্ব করে।
২. খরচ বেশি: আপনি যদি ভিডিও দেখেন বা বড় ফাইল ডাউনলোড করেন, তবে ডাটা প্যাক কিনতে কিনতে পকেট খালি হয়ে যাবে। ৩০ জিবি ডাটার দাম এখন ৫০০-৬০০ টাকা, যা ব্রডব্যান্ডের মাসিক বিলের সমান।
৩. ল্যাপটপের বারোটা: মোবাইল হটস্পট দিয়ে ল্যাপটপে নেট চালালে ফোনের চার্জ দ্রুত শেষ হয় এবং ফোন প্রচুর গরম হয়। এতে ফোনের আয়ু কমে যায়।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট (Broadband/WiFi): সুবিধা ও অসুবিধা
ফ্রিল্যান্সিংকে যদি পেশা হিসেবে নিতে চান, তবে ব্রডব্যান্ডের বিকল্প নেই। এটি আপনাকে আনলিমিটেড দুনিয়ায় নিয়ে যাবে।
সুবিধা (Pros):
১. আনলিমিটেড ডাউনলোড: সারাদিন মুভি দেখুন, টিউটোরিয়াল নামান বা গেম খেলুন—বিলের কোনো পরিবর্তন হবে না। মাসে ৫০০ টাকা দিলে আনলিমিটেড ব্যবহার করা যায়।
২. ফিক্সড স্পিড: আপনি যদি ১০ এমবিপিএস লাইন নেন, তবে সবসময় ১০ এমবিপিএস-ই পাবেন (যদি ভালো আইএসপি হয়)।
৩. ল্যাটেন্সি কম (Low Ping): বায়ারের সাথে জুম মিটিং বা ভিডিও কলে কথা বলার সময় কথা আটকে যায় না।
৪. শেয়ারিং: একটি রাউটার দিয়ে বাসার সবাই ফোন বা ল্যাপটপ চালাতে পারে।
অসুবিধা (Cons):
১. লো-শেডিং সমস্যা: কারেন্ট চলে গেলে ওয়াইফাই বন্ধ হয়ে যায়। এর জন্য আপনাকে আলাদা অনু (ONU) বা রাউটার পাওয়ার ব্যাংক কিনতে হবে।
২. তার কাটা পড়ার ভয়: ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক সময় অপটিক্যাল ফাইবার তার ছিঁড়ে যায়, যা ঠিক করতে ১-২ দিন সময় লাগে।
৩. পোর্টেবল নয়: আপনি পার্কে বা গ্রামের বাড়িতে বসে ব্রডব্যান্ড পাবেন না।

আপনার কাজের জন্য কোনটি সেরা? (তুলনামূলক বিশ্লেষণ)
সব ফ্রিল্যান্সারের কাজের ধরণ এক নয়। তাই সবার জন্য একই ইন্টারনেট দরকার নেই। নিচে আমি ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভাগ করে দিচ্ছি:
১. ডিজিটাল মার্কেটিং ও ওয়েব রিসার্চ
- কাজের ধরণ: ফেসবুক বা গুগল ব্রাউজ করা, এক্সেল শিটে কাজ করা, চ্যাট করা।
- সুপারিশ: মোবাইল ডাটা দিয়েই কাজ চালানো সম্ভব। তবে কাজের চাপ বাড়লে ৫ এমবিপিএস এর একটি শেয়ার্ড ব্রডব্যান্ড লাইন নিতে পারেন।
২. ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট
- কাজের ধরণ: কোড লেখা, লাইভ সার্ভারে কাজ করা, ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখা।
- সুপারিশ: অবশ্যই ব্রডব্যান্ড লাগবে। কারণ কোডিংয়ের সময় সার্ভার বারবার ডিসকানেক্ট হলে মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে। ১০ এমবিপিএস লাইন যথেষ্ট।
৩. গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ভিডিও এডিটিং
- কাজের ধরণ: ৫০০ এমবি বা ১ জিবির বড় বড় ফাইল ডাউনলোড ও আপলোড করা। স্টক ফুটেজ নামানো।
- সুপারিশ: মোবাইল ডাটা দিয়ে এই কাজ অসম্ভব। আপনার মিনিমাম ১৫-২০ এমবিপিএস এর রিয়েল আইপি (Real IP) সহ ব্রডব্যান্ড লাইন লাগবে।
ব্রডব্যান্ড স্পিড কত এমবিপিএস নেব? (Speed Guide)
আইএসপি (ISP) আপনাকে অনেক অফার দেবে। কিন্তু আপনার আসলে কতটুকু দরকার?
- ৫ এমবিপিএস: শুধু ব্রাউজিং এবং সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য। (খরচ: ৫০০-৬০০ টাকা)
- ১০ এমবিপিএস: ছোট ফ্রিল্যান্সিং কাজ এবং ইউটিউব দেখার জন্য পারফেক্ট। (খরচ: ৮০০-১০০০ টাকা)
- ২০+ এমবিপিএস: ভারী কাজ, গেমিং এবং বড় ফাইল আপলোডের জন্য। (খরচ: ১২০০+ টাকা)
টিপস: শেয়ার্ড (Shared) লাইন না নিয়ে ডেডিকেটেড (Dedicated) লাইন নেওয়ার চেষ্টা করবেন। শেয়ার্ড লাইনে সন্ধ্যাবেলা স্পিড কমে যায়, কারণ তখন সবাই নেট চালায়।
কারেন্ট গেলে ওয়াইফাই চালাব কীভাবে? (Power Backup)
ব্রডব্যান্ডের একমাত্র শত্রু হলো লোডশেডিং। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে এটি সলভ করা আপনার দায়িত্ব। এর জন্য আপনাকে একটি “Mini UPS” বা “Router Power Bank” কিনতে হবে।
- দাম: ১৫০০ – ২৫০০ টাকা।
- কাজ: এটি কারেন্ট চলে গেলেও আপনার রাউটার এবং অনু (ONU) কে ৪-৫ ঘণ্টা সচল রাখবে। এটি ফ্রিল্যান্সারদের জন্য লাইফ সেভার গ্যাজেট।
- জনপ্রিয় মডেল: WGP Mini UPS বা SKE।
আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ (Final Verdict)
আমি যখন ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিলাম, তখন ৩ মাস মোবাইল ডাটা দিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু যখন বড় প্রজেক্ট আসা শুরু হলো, তখন দেখলাম ডাটা কিনতে কিনতে আমার আয়ের অর্ধেক শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরে আমি ব্রডব্যান্ড লাইন নিই এবং আমার কাজের গতি ১০ গুণ বেড়ে যায়।
আপনার জন্য আমার পরামর্শ হলো—
১. আপনি যদি একদম নতুন হন এবং ইনকাম শুরু না হয়, তবে মোবাইল ডাটা দিয়েই শুরু করুন। খরচ বাঁচান।
২. যদি আপনার মাসিক ইনকাম ১০ হাজার টাকার বেশি হয়, তবে দেরি না করে আজই একটি ব্রডব্যান্ড সংযোগ নিন। এটি খরচ নয়, এটি ইনভেস্টমেন্ট।
৩. ব্যাকআপ হিসেবে ফোনে সবসময় ২-৩ জিবি ডাটা রেখে দেবেন। বলা তো যায় না, কখন ব্রডব্যান্ডের তার ইঁদুরে কেটে দেয়!
প্রিয় পাঠক, ইন্টারনেটের স্পিড যত বেশি হবে, আপনার কাজের স্পিড তত বাড়বে না, যদি না আপনার দক্ষতা বাড়ে। তাই নেটের পেছনে অতিরিক্ত টাকা খরচ না করে আগে কাজ শিখুন। ৫ এমবিপিএস স্পিড দিয়েও মাসে লক্ষ টাকা আয় করা সম্ভব, যদি আপনার স্কিল থাকে।
ইন্টারনেট কানেকশন বা রাউটার নিয়ে আপনার যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে নিচে কমেন্ট বক্সে জানাতে ভুলবেন না। আমি (সাইফুল ইসলাম) সাধ্যমতো চেষ্টা করব আপনাদের সাহায্য করতে।
শুভকামনা আপনার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারের জন্য!
