চাকরি বা পড়াশোনার পাশাপাশি একটা বাড়তি ইনকাম সোর্স কার না প্রয়োজন?
বর্তমান বাজারে শুধু একটা আয়ের ওপর নির্ভর করে চলা সত্যিই কঠিন। আমরা দিনের অনেকটা সময় ফেসবুক বা ইউটিউবে স্ক্রল করে কাটিয়ে দিই। কিন্তু আপনি কি কখনও ভেবেছেন, আপনার হাতের এই স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট কানেকশনটি ব্যবহার করে আপনি মাসে ভালো একটা অ্যামাউন্ট ইনকাম করতে পারেন?
হ্যাঁ, আমি ব্লগিং (Blogging) এর কথা বলছি।
অনেকে মনে করেন ব্লগিং মানে অনেক কঠিন কোডিং জানা বা খুব ভালো ইংরেজি পারা। সত্যি বলতে, বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। আপনার যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান থাকে এবং ধৈর্য থাকে, তবে আপনিও ব্লগিংকে একটি প্যাসিভ ইনকামের উৎস হিসেবে দাঁড় করাতে পারেন।
তবে শুরুতেই বলে রাখি—ব্লগিং কোনো “জাদুর কাঠি” নয় যে আজ শুরু করবেন আর কাল থেকেই টাকা আসা শুরু হবে। এটি একটি প্রফেশনাল কাজ।
আজকের এই গাইডে আমি আপনাদের কোনো অলীক স্বপ্ন দেখাব না। বরং, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে একজন নতুন ব্লগার হিসেবে কীভাবে শূন্য থেকে শুরু করবেন এবং কীভাবে গুগল অ্যাডসেন্স থেকে আয় করবেন—তার প্রতিটি ধাপ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেয়ার করব।
ব্লগ কি? (What is Blog)
সহজ ভাষায় বলতে গেলে ব্লগ হলো একটা ওয়েবসাইট, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরি রিলেটেড আর্টিকেল পোস্ট করা হয়ে থাকে। আর এই সকল আর্টিকেলকে ব্লগ পোস্ট বলা হয়। আর এই ব্লগ পোস্ট থেকেই ‘ব্লগিং’ কথাটি এসেছে।
আরও সহজভাবে বলতে গেলে ব্লগিং হলো একটি অনলাইন ডায়েরির মতন। যেখানে আপনি আপনার দক্ষতা, জ্ঞান, মতামত ইত্যাদি শেয়ার করতে পারবেন। এটা হতে পারে কোনো টেক্সট এর মাধ্যমে, কোনো ইমেজ এর মাধ্যমে অথবা ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে।
আপনি কেন ব্লগিং করবেন?
১. ব্লগিং এর মাধ্যমে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যায়।
২. আপনি আপনার চাকরি বা পড়াশোনার পাশাপাশি ব্লগিং করে ইনকাম করতে পারবেন।
৩. আপনি আপনার পছন্দের বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারবেন।
৪. আপনি ঘরে বসেই ইনকাম শুরু করতে পারবেন।
কীভাবে ব্লগিং শুরু করবেন? (৭টি ধাপ)
চলুন এখন জেনে নেই আপনি যদি ব্লগিং করতে চান তাহলে কিভাবে শুরু করবেন। একদম বেসিক থেকে আলোচনা করা হলো:

প্রথম কাজঃ ক্যাটাগরি নির্বাচন
ব্লগিং করতে চাইলে সবার প্রথমেই আপনাকে নির্বাচন করতে হবে আপনি কোন ক্যাটাগরির ব্লগ সাইট তৈরি করতে চান। মানে হলো আপনি আপনার ওয়েবসাইটে কোন টপিক সম্পর্কে আর্টিকেল লিখতে চান সেটা নির্বাচন করতে হবে। সেটা হতে পারে টেকনোলজি, খাবার, নিউজ ইত্যাদি।
দ্বিতীয় কাজঃ ব্লগসাইট/ওয়েবসাইট বানানো
ক্যাটাগরি নির্বাচন করার পর আপনাকে একটি ব্লগ সাইট বা ওয়েবসাইট তৈরি করতে হবে। যেকোনো ওয়েবসাইট তৈরি করতে দুটি জিনিস প্রয়োজন—একটি ডোমেইন আর একটি হোস্টিং।
- ফ্রি পদ্ধতি: যদি ফ্রিতে বানাতে চান তাহলে আপনি গুগলের
Bloggerব্যবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনার ওয়েবসাইট এর নাম হবেYourWebsitename.Blogspot.com। - পেইড পদ্ধতি: প্রফেশনাল কাজের জন্য ডোমেইন ও হোস্টিং কিনে ওয়ার্ডপ্রেস (WordPress) দিয়ে সাইট বানানোই সেরা। এতে সাইটের নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে থাকে। সেক্ষেত্রে আপনার ওয়েবসাইট হবে
YourWebsitename.com।
তৃতীয় কাজঃ ওয়েবসাইট ডিজাইন
এখন আপনাকে আপনার ওয়েবসাইটটি সুন্দরভাবে ডিজাইন করতে হবে। সাইট দেখতে সুন্দর হলে ভিজিটররা বেশিক্ষণ আপনার সাইটে থাকবে। আপনি ওয়ার্ডপ্রেস এর মাধ্যমে এই কাজটি করতে পারেন অথবা এইচটিএমএল কোড এর মাধ্যমেও আপনার ওয়েবসাইটটি ডিজাইন করতে পারেন। নিজে না পারলে একজন ওয়েব ডেভেলপারকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিতে পারেন।
চতুর্থ কাজঃ আর্টিকেল পোস্ট
এখন আপনার একটি ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে গেছে, এখন আপনাকে এখানে বিভিন্ন আর্টিকেল পোস্ট করতে হবে। অবশ্যই প্রয়োজনীয় আর্টিকেল লিখবেন যেটা অন্যের উপকারে আসে।
- সতর্কতা: কোনো ওয়েবসাইট থেকে কপি করে কিছু পোস্ট বা পাবলিশ করবেন না। অন্যের কোনো ইমেজ বা ফটো ব্যবহার করবেন না। আপনি আপনার সাইটে মিনিমাম ২০-২৫ টা আর্টিকেল পাবলিশ করবেন। আর একটা কথা মনে রাখবেন, প্রতি আর্টিকেল যেন ৫০০ ওয়ার্ড এর বেশি হয়। চেষ্টা করবেন ১০০০-১২০০ বা তার বেশি ওয়ার্ড ব্যবহার করে প্রতিটি আর্টিকেল লিখতে।
পঞ্চম কাজঃ এসইও (SEO)
এই পর্যায়ে আপনাকে আপনার সাইটের জন্য এসইও বা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন করতে হবে। এসইও সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে—অন পেজ এবং অফ পেজ। এসইও করার মাধ্যমে আপনার ওয়েবসাইটটি গুগল সার্চ ইঞ্জিনে র্যাঙ্ক করাতে হবে যেন প্রতিদিন বিপুল পরিমান ভিজিটর আপনার ওয়েবসাইট ভিজিট করে এবং আপনার আর্টিকেলগুলো পড়ে।
ষষ্ঠ কাজঃ গুগল অ্যাডসেন্স এর জন্য অ্যাপ্লাই
আপনার সাইটে অনেক আর্টিকেল আছে এবং প্রতিদিন অনেক ভিজিটর আসে—তাহলে কি আপনার ইনকাম শুরু হয়ে গেছে? উত্তর হচ্ছে, না। কারণ আপনার ইনকাম হবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। অর্থাৎ আপনার ওয়েবসাইটটি যেকোনো অ্যাড নেটওয়ার্কের সাথে কানেক্ট করতে হবে। বাংলা ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেয় এমন অনেক অ্যাড নেটওয়ার্ক আছে, তবে এদের মধ্যে সবথেকে বেস্ট হলো গুগল অ্যাডসেন্স।
এই পর্যায়ে আপনি গুগল অ্যাডসেন্স এর জন্য অ্যাপ্লাই করবেন। অ্যাপ্লাই করার পর গুগল আপনার ওয়েবসাইটটি রিভিউ করে দেখবে। যদি সব কিছু ঠিক থাকে তাহলে গুগল আপনার ওয়েবসাইটে অ্যাড শো করার অনুমোদন দিয়ে দিবে। এরপর আপনি গুগলের অ্যাড কোড আপনার ওয়েবসাইটে এড করে দিলেই বিজ্ঞাপন চালু হয়ে যাবে। এখন থেকে আপনার ওয়েবসাইটে যত বেশি ভিজিটর আসবে আপনার তত বেশি ইনকাম হবে।
সপ্তম কাজঃ টাকা উত্তোলন
আপনার অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্টে ১০০ ডলার হলেই গুগল আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিবে। তারপর আপনি আপনার ডেবিট কার্ড দিয়ে টাকা এটিএম বুথ থেকে তুলতে পারবেন।
ব্লগিং করে আয়ের ৫টি সেরা উপায়
ব্লগিং করে আয়ের অসংখ্য উপায় রয়েছে। নিচে জনপ্রিয় ৫টি উপায় আলোচনা করা হলো:

১. গুগল অ্যাডসেন্স (Google AdSense):
বর্তমান যুগে বিশ্বে সব থেকে জনপ্রিয় অনলাইন আয়ের মাধ্যম হলো গুগল অ্যাডসেন্স। আপনার ব্লগে গুগল অ্যাডসেন্স এর অ্যাড শো করে আপনি ইনকাম করতে পারবেন। তবে গুগল অ্যাডসেন্স পাওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে—আপনার ব্লগে যথেষ্ট পোস্ট থাকতে হবে, গুগলের সকল পলিসি মানতে হবে এবং ওয়েবসাইটে ভিজিটর থাকতে হবে।
২. অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং (Affiliate Marketing):
আপনি চাইলে কোনো প্রোডাক্ট সম্পর্কে রিভিউ লিখে নিচে সেই প্রোডাক্টের অ্যাফিলিয়েট লিংক দিয়ে দিতে পারেন। কেউ যদি লিংক থেকে প্রোডাক্টটা ক্রয় করে তবে আপনি একটি নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ কমিশন পাবেন।
৩. স্পন্সরড ব্লগ পোস্ট:
আপনার ওয়েবসাইটে যখন অনেক বেশি ভিজিটর আসবে, তখন অনেক ভালো ভালো কোম্পানি আপনার ওয়েবসাইটে তাদের প্রোডাক্ট বা সেবা সম্পর্কে পোস্ট দিতে চাইবে। এর জন্য আপনাকে তারা টাকাও দিবে।
৪. সার্ভিস প্রদান:
আপনি যদি এসইও করতে পারেন এবং এসইও কাজ করতে চান তাহলে আপনার ব্লগের মাধ্যমে কাজ পেতে পারেন। আবার আপনি চাইলে আপনার ব্লগকে কাজের নমুনা বা পোর্টফোলিও হিসেবেও দেখাতে পারেন।
৫. প্রোডাক্ট বিক্রি (Product Sale):
আপনি আপনার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ই-বুক, বা অনলাইন বিভিন্ন ক্লাস ও বিক্রি করতে পারবেন।
ব্লগিংয়ে সফল হওয়ার টিপস
১. ধৈর্য ধরুন:
আপনি ব্লগিং শুরু করেই ইনকাম এর আশা করবেন না। কারণ একটা ব্লগ পপুলার হতে, ভিজিটর আনতে এবং গুগল অ্যাডসেন্স অনুমোদন পেতে বেশ কিছু সময় লেগে যায়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। অন্তত ৩-৬ মাস সময় দিন।
২. নিয়মিত কন্টেন্ট:
প্রতিদিন বা সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে পোস্ট করার চেষ্টা করুন। অনিয়মিত হলে ভিজিটর কমে যাবে। আপনাকে নিয়মিত ভালো ভালো কন্টেন্ট পোস্ট করতে হবে। কারণ আপনি যদি ভালো কন্টেন্ট না দেন তাহলে ভিজিটর আসবে না।
৩. ভিজিটরদের গুরুত্ব দিন:
যদি দেখেন যে কোনো ভিজিটর আপনার কোনো পোস্ট বা আর্টিকেলে কমেন্ট বা ফিডব্যাক দিয়েছে তাহলে অবশ্যই তার কমেন্টকে গুরুত্ব দিন এবং উত্তর দিন। আপনি কি জানেন? এটা আপনার এসইও-র ক্ষেত্রেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
৪. সোশ্যাল শেয়ার:
নিজের আর্টিকেল নিজেই প্রচার করার চেষ্টা করুন। নিজের লেখা ফেসবুকে বা লিঙ্কডিনে শেয়ার করে প্রচার করুন।
৫. কপি করবেন না:
সবসময় ইউনিক আর্টিকেল লিখবেন। গুগল কপি কন্টেন্ট ধরে ফেললে আপনার সাইট কখনোই র্যাংক করবে না।
৬. এসইও জানতে হবে:
আপনাকে অবশ্যই এসইও সম্পর্কে জানতে হবে। কারণ এসইও ছাড়া আপনি কখনোই আপনার ওয়েবসাইটকে গুগল সার্চ ইঞ্জিনে র্যাঙ্ক করাতে পারবেন না। তাই কমপক্ষে প্রাথমিক ধারনা আপনার থাকতেই হবে।
শেষ কথা:
আপনার যদি একটি সঠিক প্ল্যান থাকে এবং আপনি যদি সেই প্ল্যান অনুযায়ী ধাপে ধাপে কাজ করতে পারেন, তাহলে ব্লগিং হতে পারে একটি উত্তম আয়ের উৎস। আপনি একটা দিন দেখবেন যে আপনার ওয়েবসাইটটা একটি ব্রান্ড-এ পরিনত হয়েছে।
আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে কিভাবে একটি ব্লগ ওয়েবসাইট থেকে ইনকাম করা যায়। তারপরও যদি আপনার কোনো কিছু বুঝতে অসুবিধা হয় কিংবা কোনো কিছু জানার থাকে অবশ্যই এই পোস্টের কমেন্টে জানাবেন। আমি ১০০% ট্রাই করব আপনাদের প্রবলেম সমাধান করতে। দেখা হবে পরের আর্টিকেলে, সেই পর্যন্ত সকলেই ভালো থাকুন।
