আপনি কি আপওয়ার্ক, ফাইবার বা পেওনিয়ার থেকে কষ্টের ডলার দেশে আনছেন, কিন্তু সরকারি ২.৫% বোনাস (প্রণোদনা) পাচ্ছেন না? অথবা, আপনি কি চান আপনার আয় করা ডলার টাকায় কনভার্ট না হয়ে সরাসরি ডলার হিসেবেই ব্যাংকে জমা থাকুক, যাতে পরে ডোমেইন-হোস্টিং বা ফেসবুক অ্যাডের বিল দেওয়া যায়?
অধিকাংশ নতুন ফ্রিল্যান্সার যে ভুলটি করেন তা হলো—তারা মার্কেটপ্লেস থেকে সরাসরি তাদের সাধারণ সেভিংস একাউন্টে (Savings Account) বা বিকাশে টাকা নিয়ে আসেন। এতে সাময়িকভাবে টাকা হাতে পেলেও, তারা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ব্যাংকিংয়ের বড় সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হন। সাধারণ একাউন্টে রেমিট্যান্স আনলে অনেক সময় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয় বা টাকার উৎস জানতে চেয়ে হয়রানি করে।
এই সমস্যার একমাত্র এবং প্রফেশনাল সমাধান হলো—“ফ্রিল্যান্সার ব্যাংক একাউন্ট” এবং এর সাথে সংযুক্ত “ইআরকিউ (ERQ) একাউন্ট”।
আজকের এই কমপ্লিট গাইডলাইনে আমি আপনাদের একদম সহজ ভাষায় বোঝাব—ইআরকিউ একাউন্ট কী? ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কোন ব্যাংক সেরা? এবং ঘরে বসে বা ব্যাংকে গিয়ে কীভাবে এই একাউন্ট খুলবেন? চলুন, স্মার্ট ব্যাংকিংয়ের দুনিয়ায় প্রবেশ করি।
ফ্রিল্যান্সার ব্যাংক একাউন্ট এবং ERQ একাউন্ট কী?
বিষয়টি একটু মনোযোগ দিয়ে বুঝুন। সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাংকগুলো সেভিংস বা কারেন্ট একাউন্ট খোলে। কিন্তু যারা আইটি (IT) প্রফেশনাল বা ফ্রিল্যান্সার, বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের জন্য বিশেষ ক্যাটাগরির একাউন্ট খোলার অনুমতি দিয়েছে।
ERQ (Exporter’s Retention Quota) একাউন্ট কী?
ERQ এর পূর্ণরূপ হলো এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা। সহজ বাংলায়, আপনি যখন বিদেশ থেকে ১০০ ডলার আয় করে দেশে আনবেন, তখন সাধারণ নিয়মে পুরো ১০০ ডলারই বাংলাদেশি টাকায় (BDT) কনভার্ট হয়ে যায়। কিন্তু আপনার যদি একটি ERQ একাউন্ট থাকে, তবে আপনি ওই ১০০ ডলারের মধ্যে ৭০% (অর্থাৎ ৭০ ডলার) সরাসরি ডলার (USD) হিসেবে ব্যাংকে জমা রাখতে পারবেন। বাকি ৩০% টাকায় কনভার্ট হয়ে আপনার সাধারণ একাউন্টে জমা হবে।
ডলার ধরে রাখার এই জাদুকরী একাউন্টকেই বলা হয় ERQ একাউন্ট। এটি খোলার জন্য আপনার কোনো পাসপোর্টের প্রয়োজন নেই!
কেন একজন ফ্রিল্যান্সারের ERQ একাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক?
আপনি যদি ফ্রিল্যান্সিংকে প্রফেশন হিসেবে নেন, তবে এই একাউন্টের সুবিধাগুলো আপনার মাথা ঘুরিয়ে দেবে:
১. ডলার জমানোর আইনি অধিকার:
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ মানুষ ডলার জমা রাখতে পারে না। কিন্তু ERQ একাউন্ট থাকলে আপনি সম্পূর্ণ বৈধভাবে নিজের একাউন্টে ডলার রাখতে পারবেন।
২. ফেসবুক বা গুগলে পেমেন্ট:
আপনার ERQ একাউন্টে জমানো ডলার দিয়ে আপনি খুব সহজেই ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট করতে পারবেন। আলাদা করে পাসপোর্ট এন্ডোর্স করে ডলার কেনার কোনো ঝামেলা নেই।
৩. সরকারি ২.৫% প্রণোদনা (Incentive):
আপনি যখন ফ্রিল্যান্সার কোটায় টাকা দেশে আনবেন, তখন বাংলাদেশ সরকার আপনাকে প্রতি ১০০ টাকায় আড়াই টাকা বোনাস দেবে। অর্থাৎ ১ লক্ষ টাকা আনলে আড়াই হাজার টাকা সম্পূর্ণ ফ্রি! সাধারণ একাউন্টে এই বোনাস পেতে অনেক হয়রানি পোহাতে হয়।
৪. ভিসা প্রসেসিং ও লোন:
ফ্রিল্যান্সার একাউন্টের স্টেটমেন্ট খুবই শক্তিশালী হয়। ভবিষ্যতে গাড়ি কেনা, হোম লোন নেওয়া বা বিদেশে যাওয়ার জন্য এই স্টেটমেন্ট জাদুর মতো কাজ করে।
পেওনিয়ার (Payoneer) একাউন্ট খোলার সঠিক নিয়ম ২০২৬
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সেরা ব্যাংক কোনটি? (Top Banks in 2026)
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সব ব্যাংকই এই সুবিধা দিচ্ছে। তবে টেকনোলজি এবং সার্ভিসের দিক থেকে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সেরা ৩টি ব্যাংকের তালিকা নিচে দিলাম:
১. ব্যাংক এশিয়া (Bank Asia – Swadhin)
ফ্রিল্যান্সারদের কাছে ব্যাংক এশিয়া সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় তাদের “স্বাধীন একাউন্ট” এবং “স্বাধীন মাস্টারকার্ড” এর কারণে। তারা পেওনিয়ার (Payoneer) এর সাথে সরাসরি পার্টনারশিপ করেছে। আপনি খুব সহজেই পেওনিয়ার থেকে টাকা তাদের একাউন্টে ট্রান্সফার করতে পারবেন এবং সাথে সাথে ERQ সুবিধা পাবেন।
২. ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (EBL)
ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের ক্ষেত্রে ইবিএল সবসময়ই এক ধাপ এগিয়ে। তাদের “EBL Freelancer Account” খুললে তারা আপনাকে একটি চমৎকার ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ড দেবে। তাদের কাস্টমার সার্ভিস এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং (EBL Skybanking) দেশের অন্যতম সেরা।
৩. দি সিটি ব্যাংক (The City Bank)
সিটি ব্যাংকের “সিটি আলো” এবং ফ্রিল্যান্সার একাউন্টগুলো খুবই আধুনিক। তাদের অ্যাপ দিয়ে ঘরে বসেই অনেক কাজ করা যায়। এছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক (BRAC Bank) এর “ফ্রিল্যান্সার ম্যাট্রিক্স” একাউন্টটিও দারুণ একটি অপশন।
আমার পরামর্শ: আপনার বাড়ির সবচেয়ে কাছে যে ব্যাংকের শাখা আছে, এবং যাদের এটিএম বুথ বেশি, তাদের সাথেই একাউন্ট খুলুন।
ফ্রিল্যান্সার এবং ERQ একাউন্ট খুলতে কী কী ডকুমেন্টস লাগবে?
ব্যাংকে যাওয়ার আগে ফাইলটি সুন্দর করে গুছিয়ে নিন। সাধারণ একাউন্টের চেয়ে এখানে কিছু বাড়তি কাগজ লাগবে:
১. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): আপনার অরিজিনাল এনআইডি এবং ১ কপি ফটোকপি।
২. ছবি: আপনার ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি এবং নমিনির (যাকে উত্তরাধিকারী বানাবেন) ১ কপি ছবি ও তার এনআইডির ফটোকপি।
৩. টিন সার্টিফিকেট (E-TIN): ফ্রিল্যান্সার একাউন্ট করতে টিআইএন সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক। (আপনার যদি টিন না থাকে, তবে আমাদের ওয়েবসাইটের আগের পোস্টটি পড়ে মাত্র ৫ মিনিটে ঘরে বসেই টিন করে নিন)।
৪. আয়ের প্রমাণপত্র (Proof of Income): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংককে বোঝাতে হবে যে আপনি আসলেই ফ্রিল্যান্সার। এর জন্য আপনি ফাইবার/আপওয়ার্কের প্রোফাইলের স্ক্রিনশট, আর্নিং ড্যাশবোর্ডের প্রিন্ট কপি, অথবা পেওনিয়ারের ট্রানজেকশন স্টেটমেন্ট প্রিন্ট করে নিয়ে যাবেন।
৫. BASIS বা ফ্রিল্যান্সার আইডি (Optional): বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। না থাকলেও সমস্যা নেই, প্রোফাইলের ছবিই যথেষ্ট।

ব্যাংকে গিয়ে একাউন্ট খোলার স্টেপ-বাই-স্টেপ প্রসেস
একটি বাস্তব সত্য কথা বলি—অনেক ব্যাংকের সাধারণ অফিসাররা বা ক্যাশিয়াররা ERQ একাউন্ট সম্পর্কে ভালো বোঝেন না। আপনি গিয়ে “ERQ একাউন্ট খুলব” বললে তারা হয়তো হা করে তাকিয়ে থাকবে। তাই নিচের টিপসগুলো ফলো করুন:
১: ব্যাংকে ঢুকে সরাসরি “Foreign Exchange (ফরেন এক্সচেঞ্জ)” বা “জেনারেল ব্যাংকিং” ডেস্কে যিনি বসেন, তার কাছে যান।
২: তাকে গিয়ে পরিষ্কারভাবে বলুন, “আমি একজন আইটি ফ্রিল্যান্সার। রেমিট্যান্স আনার জন্য আমি একটি ফ্রিল্যান্সার সেভিংস একাউন্ট এবং এর সাথে একটি ERQ (Exporter’s Retention Quota) একাউন্ট খুলতে চাই।”
৩: অফিসার আপনাকে দুটি ফর্ম দেবেন। একটি সাধারণ সেভিংস একাউন্টের এবং আরেকটি ERQ এর। ফর্মগুলো সতর্কতার সাথে পূরণ করুন।
৪: ফর্ম পূরণ হলে আপনার আয়ের প্রমাণপত্রগুলো জমা দিন।
৫: একাউন্ট ওপেন হয়ে গেলে তাদের কাছে একটি “ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ড” এর জন্য আবেদন করুন, যা সরাসরি আপনার ERQ একাউন্টের সাথে লিংক করা থাকবে।
ব্যাস! আপনার প্রফেশনাল ফ্রিল্যান্সিং ব্যাংকিং শুরু হয়ে গেল।
নতুনদের জন্য কিছু বিশেষ সতর্কতা (Warning)
১. ফর্ম-সি (Form-C) ডিক্লারেশন: যখনই আপনার একাউন্টে বড় অ্যামাউন্টের ডলার (যেমন: ১০,০০০ ডলার বা তার বেশি) আসবে, তখন ব্যাংক আপনাকে একটি ‘Form-C’ পূরণ করতে বলতে পারে। এটি মূলত বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানোর জন্য যে টাকাটা বৈধ পথে এসেছে। এটি নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
২. পাসপোর্ট ছাড়াই কার্ড: ERQ একাউন্টের বিপরীতে যে ডুয়াল কারেন্সি কার্ড দেওয়া হয়, তাতে পেমেন্ট করার জন্য পাসপোর্টে ডলার এন্ডোর্স করার প্রয়োজন হয় না। কারণ টাকাটা আপনারই আয় করা ডলার। এটি এই একাউন্টের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক।
৩. একাউন্ট মেইনটেইনেন্স ফি: স্টুডেন্ট একাউন্টে চার্জ না কাটলেও, ফ্রিল্যান্সার একাউন্টে বছরে নির্দিষ্ট একটি চার্জ (সাধারণত ৫০০-১০০০ টাকা) কাটতে পারে। তাই একাউন্ট খোলার সময় অফিসারের কাছ থেকে চার্জের বিষয়টি পরিষ্কার করে জেনে নেবেন।
প্রফেশনাল হোন, নিরাপদ থাকুন
প্রিয় পাঠক, ফ্রিল্যান্সিং কোনো শখের বিষয় নয়, এটি একটি গ্লোবাল প্রফেশন। আপনি যখন আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করছেন, তখন আপনার ব্যাংকিং ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক মানের হওয়া উচিত।
শুধুমাত্র বিকাশ বা সাধারণ সেভিংস একাউন্টের ওপর নির্ভর না করে, আজই আপনার নিকটস্থ ব্যাংকে গিয়ে একটি ফ্রিল্যান্সার ও ERQ একাউন্ট খুলে ফেলুন। এটি আপনার কষ্টার্জিত টাকাকে নিরাপদ রাখবে, আপনাকে আড়াই শতাংশ সরকারি বোনাস এনে দেবে এবং আপনার ক্যারিয়ারকে এক ধাপ এগিয়ে নেবে।
আশা করি আজকের এই বিস্তারিত গাইডলাইনটি আপনাদের অনেক কনফিউশন দূর করেছে। ডুয়াল কারেন্সি কার্ড, ই-টিন বা পেওনিয়ার নিয়ে আপনাদের যদি আরও জানার থাকে, তবে আমাদের সাইটের আগের আর্টিকেলগুলো পড়ে দেখতে পারেন।
ফ্রিল্যান্সিং বা ব্যাংকিং নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করুন।
